প্রবুদ্ধসুন্দর কর || প্রথম পর্ব

নীল উপত্যকার রাখাল

573
VIEWS

এক

“When did my childhood go?”

মার্কাস নাতেনের চাইল্ডহুড কবিতার সেই প্রশ্ন যদি বারবার ধ্বনিত হয় তবে আমি অবশ্যই উত্তর দেব, যেদিন প্রথম আমি রাজধানী থেকে ১১৫ কিমি দূরে হালাহালিতে পৌঁছেছি।

হালাহালি। তৎকালীন কমলপুর মহকুমার গঞ্জ। রাজধানী আগরতলা থেকে ১১৫ কিমি দূরে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন টপকে বাবার অন প্রমোশন ট্রান্সফার। মা, আমি, বোন; আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগেই বাবা হালাহালি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে জয়েন করেন। পরিচিত বলতে ঠাকুরদার  মামাতো ভাই মানিক দেব। সম্পর্কে বাবার কাকা। হালাহালি বাজারের ব্যবসায়ী। বাসন কোসনের দোকান। দুই ভাই মানিক ও মোহনের পারিবারিক ব্যবসা। ওদের বাড়িতেই বাবাকে গিয়ে উঠতে হল।

ক্লাস এইট থেকে মাধ্যমিক, কৈশোরের সাড়ে তিন বছর কাটিয়েছি। উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের মতো আজও  হালাহালি আমার প্রথম ইনিসফ্রি আইল্যান্ড। সমুদ্র নেই। ধলাই নামের ছোট্ট এক নদী আছে। কোনো দ্বীপ নেই। ধলাইয়ের উর্বর পলিমাটির চর আছে। ধলাই, অবাধ্য এক নদী। ত্রিপুরার অন্য নদীগুলোর মতো নয়। এর স্রোত উল্টোদিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে শ্রীহট্ট তথা সিলেটের সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই নদীতেই আমার গ্রীষ্ম ও বর্ষার স্নান। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিতাস বলেছিলেন, এক নদীতে একবারই স্নান হয়। এই নদীতে আমার প্রতিটি স্নানই নতুন।  ধলাই নদীর কাছেই আমার ঘাড়ত্যারামির দীক্ষা যেহেতু এর স্রোত উল্টো।

হালাহালিতেই আমি আবিষ্কার করি আমার ভেতর আবেগে ফুঁপিয়ে-ওঠা এক অপরিণত, হঠকারী প্রেমিককে। আবিষ্কার করি এক আধা বোহেমিয়ানকে, নিসর্গ যাকে ফুঁসলে নিয়ে সৌন্দর্য ও নিষিদ্ধতার সেঁকোবিষ খাইয়ে আচ্ছন্ন করে রাখে। দুই পাহাড়ের মাঝখানে আমবাসা থেকে কমলপুর, এক নীল উপত্যকা। একদিকে লংতরাই। আরেকদিকে আঠারোমুড়া পাহাড়। আমাকে অবশ্য সবচেয়ে বেশি হাতছানি দিত লংতরাই। বৃষ্টির পর রং পালটানো এই পাহাড়ের দিকে সমাহিতের মতোই তাকিয়ে থাকতাম। বসন্তে, বর্ষায়, শীতে এই লংতরাই কখনো বিবর্ণ সবুজ। কখনো ময়ূরনীল। কখনো কুয়াশাচ্ছন্ন নীল। তুলনায় হালাহালি উপত্যকা থেকে আঠারোমুড়া কাছের দৃশ্যমান পাহাড় হলেও শুধু কোনো কোনো রাতে জুমচাষের আগুনে লাল হয়ে উঠলে তাকিয়ে থাকতাম সেই দিব্য লালিমার দিকে।

***

দুই

১৯৮১ সালের জানুয়ারি। দাঙ্গাদীর্ণ ত্রিপুরায় তখনো ফিরে আসেনি পারস্পরিক বিশ্বাস। কেন দাঙ্গা তা বোঝার বয়স হয়নি। শুনতাম জিবি হাসপাতালে অস্ত্রের ঘায়ে আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে। শুনতাম মান্দাই গণহত্যাকাণ্ড। পাড়ায় পাড়ায় পাহারা। রেডিয়োতে কার্ফুর ঘোষণা। জানলাম, কার্ফু মানে পথে বেরোলেই পুলিশের গুলি। বি এস এফের টহল। দিনে বি এস এফ দেখলেই আমরা ডেকে উঠতাম, ও বন্ধু। ওরাও হাত তুলে বন্ধু বলে পাল্টা হাঁক দিত।

ক্লাস সেভেন থেকে সবে ফার্স্ট হয়ে এইটে উঠেছি। পরীক্ষার পরপরই পক্স। দিনের বেলাতেই মশারি টাঙিয়ে দেওয়া হল। আমাদের বড়ো একটা বুশ রেডিয়ো নিয়ে ঢুকে পড়লাম মশারির ভেতর। মা শীতলার দয়া। শুয়ে শুয়ে সারাদিন রেডিয়ো শুনি। আকাশবাণী আগরতলা ও রেডিয়ো বাংলাদেশ। গান, খবর, শ্রুতিনাটক, সিনেমার বিজ্ঞাপন, মায়াবড়ি, আলেস্কো বিস্কুট, আজান, মোনাজাতের গান, লঞ্চ ও ট্রেন ছাড়ার সময়সূচি, অনুরোধের আসর, আবহাওয়ার বিজ্ঞপ্তি, রাজা কনডোম অতি উত্তম সব পুরুষের জন্য। এই কনডোম যে কী বস্তু বুঝে উঠতে পারতাম না। রাজ্জাক শাবানা, আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে। এভাবেই বাংলাদেশ নিয়ে এক কল্পনার জগৎ তৈরি হয়ে ওঠে। রোজ আচার্য ঠাকুরমশাই এসে নিমের ডাল দিয়ে ঝাড়ফুঁক করে যেতেন। ক্লাস সেভেন থেকেই আমার মৃত্যুচেতনা ও ভয়ের শুরু।  পক্স থেকে সেরে উঠেই হালাহালি যাত্রার তোড়জোড়।

একদিন ভোরে কৃষ্ণনগর টি আর টি সি টার্মিনাস থেকে সপরিবারে কমলপুরের বাস। হোল্ড অল ও চটের বস্তায় বাসনপত্র, গৃহস্থালির সামগ্রী। বড়মুড়া, আঠারোমুড়া দুই পাহাড় পেরিয়ে আমবাসা থেকে রাস্তা বেঁকে গেছে কমলপুরের দিকে। লংতরাই পাহাড় ও ধলাই নদীকে ডানদিকে রেখে কুলাই, ভাতখাওরি, সালেমা, আভাঙ্গা, শান্তিরবাজার, বড়লুৎমা, নাকফুল পেরিয়ে হালাহালি বাজারে পৌঁছোতে দুপুর হয়ে গেল। ছোটোবেলা সমাজবিদ্যা বইয়ে পড়া এই তাহলে হালাহালি!

(ক্রমশ)